জানা, অজানা, ভুল জানা এবং ভালো পোকারা

লেখক: Kris A.G. Wyckhuys, Chrysalis Consulting

গুজবেরিফল আমার দাদির খুবই প্রিয় ছিল

পশ্চিম ফ্ল্যান্ডারসে তাঁর বাড়ির ছোট্ট উঠোনে বেড়ে ওঠা বাগানে নানা রঙের, নানা আকৃতির নানান রকমের কচকচে ফলের সারিবদ্ধ গাছ। বন্ধুবান্ধব, পাড়াপ্রতিবেশী এবং সৌখিন উদ্যানবিদ্দের সঙ্গে গাছের কলম বিনিময়ের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্নভাবে গাছ সংগ্রহ করে জীবনের অনেকটা সময় তিনি ব্যয় করেছেন। ঘন ঝোপঝাড়ের মধ্যে তাদের পরিচর্যা করতেন, যার ফলে বছর শেষে তিনি বালতি ভরতি সুস্বাদু বেরিফল পেতেন এবং সেগুলো দিয়ে মুখরোচক জ্যাম, মিষ্টি বা সুগন্ধি খাবার তৈরি হতো।

বসন্তের শুরু থেকে শরৎকাল পর্যন্ত দাদি এর প্রতিটি নিখুঁতভাবে ঢেকে রাখতেন জাবপোকা, স-ফ্লাই, শুঁয়োপোকা এবং অন্য সবধরনের ক্ষুদ্র ও লুকিয়ে থাকা পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। জাবপোকার বাসতি যদিও কম ছিল তবুও তাদের কারণে পাতা কু‚চকে যেতÑ জাবপোকাদের প্রতিটি বসতিতে পরজীবী বোলতা, শিকারি পোকারা এবং উজ্জ্বল রঙের গুবরেপোকারা যখন সদা জাগ্রত সৈনিকের মতো পাহারা দিত তখন তারা আর সংখ্যায় বাড়তে পারত না।  

তবুও, এইসব ক্ষুদে ছয়পেয়ে প্রাণী কীটপতঙ্গ এবং উপকারী পোকামাকড়গুলো দাদির চরম শত্রæ ছিল। তাঁকে সত্যিকারের অনিষ্টকারী প্রাণী যেমন : ইঁদুর, বেজি, শিয়াল ইত্যাদি ঠিকভাবে মোকাবিলা করতে হয়েছিল! এমনকি এর জন্য বছরে একবার হল্যান্ডের মধ্যে সীমানা পারাপারেরও ব্যাপার ছিল, যেখান ১৯৪০ সালের দিকে জার্মানির একটি কোম্পানি আইজি ফারবেন [IG Farben]-এর বানানো অতিমাত্রায় বিষাক্ত কীটনাশক অরগানোফসফেট এখনও কিনতে পাওয়া যায়। এইভাবে বিষাক্ত পদার্থ মজুদ করে দাদি ছয়পেয়ে প্রাণীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। 

কৃষকদের ক্ষুদে সাহায্যকারী

রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা শুধু ফ্ল্যান্ডারসের প্রবীণ অপেশাদার বাগান-মালিকদেরই বৈশিষ্ট্য নয়। মূলত এটি বিশ্বজুড়ে বহু বাগান-মালিক এবং কৃষকদের কীটপতঙ্গ পরিচালনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে এবং তাদের ইকোলজিকাল জ্ঞনের সীমাবদ্ধতাও নির্দেশ করে। যদিও কৃষক এবং খাদ্যসামগ্রী উৎপাদনকারীরা প্রায়শই দৈহিকভাবে বড়ো বা সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জীব যেমন (শস্যের কীটপতঙ্গ, মৌমাছি, দলবদ্ধ বোলতা বা প্রজাপতি) ইত্যাদির সুনির্দিষ্ট নাম দিয়ে থাকেন। তবে, খামারে বসত করে এমন অন্যান্য প্রাণী বা কীটপতঙ্গ তাদের কাছে একেবারে অজানাই থেকে যায়।       

গুবরেপোকাগুলো খুব সম্ভবত দাদির জন্য সৌভাগ্যের প্রতীক ছিল। তবে, সেগুলো যখন গুজবেরিফলের ক্ষেতে নেমে আসত তখন অবশ্যই তিনি তা পছন্দ করতেন না, অথবা তিনি জানতেন না যে, গুবরেপোকারা জাবপোকাদের চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে পারে। বরং জৈবিক দমন বিষয়ে অসচেতন হওয়ার দরুন, অরগানোফসফেট ছিটিয়ে নিয়মিত ‘ডাস্টিং’ করাতেই তাঁর অবিচল আস্থা ছিল।  

রাশিয়ার ভোলগা অঞ্চলে বাণিজ্যিক গম চাষ থেকে শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পালাউসের বার্লি ক্ষেতে অথবা থাইল্যান্ডের ক্ষুদ্রচাষিদের ধানক্ষেত পর্যন্ত বিশ^জুড়ে এই একই ধরন দেখা যায়। আমাদের সাম্প্রতিক কিছু কাজ থেকে এটা জানা যায় যে, বর্তমান অবস্থায় একজনেরও (১!) কম  কৃষক তাদের নিজস্ব শস্য উৎপাদন বা চাষাবাদ ব্যবস্থায় কীটপতঙ্গ দমনে ‘ভালো’ প্রাণীর সংখ্যা কীভাবে কম গণনা করেন। 

তার ওপর, বিশ্বের শতকরা প্রায় ৭০ভাগ কৃষক জৈবিক দমনের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। অর্থাৎ,    অমেরুদন্ডী শিকারি প্রাণী, হাইমেনোপেটারন পরজীবী এবং অনুজীবদের সমস্ত অনুচরের অবদানে সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম পরিচালিত। এটি সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার যে, জৈবিক দমন পরিষেবা কৃষকদের প্রতিহেক্টর জমিতে নিয়মিতভাবে কয়েক হাজার টাকা এবং জৈবিক চোট বা আঘাত এবং এগ্রোলোজিকাল বিপর্যয় সামলাতে সহায়তা করে। গুবরেপোকা এবং অন্যান্য অগণিত অমেরুদন্ডী শিকারি প্রাণীরা প্রকৃত অর্থে কৃষকদের সবচেয়ে অনুগত বন্ধু, ফসল রক্ষা করার জন্য তারা ২৪ ঘণ্টা বা সবসময় কাজ করে। যদিও তাদের পরিষেবাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপ্রকাশিত এবং অপ্রশংসিতই থেকে যায়।

পর্যবেক্ষণের শক্তি

কিছুসংখ্যক কৃষক অবশ্য খেয়াল করেন না যে, সচেতনতা বাড়ানো এবং মাঠ-পর্যায়ে ইকোলজিকাল প্রক্রিয়গুলোর সতর্ক পর্যবেক্ষণ বড়ো ধরনের পার্থক্য আনতে পারে। মধ্য আমেরিকার ‘মিলপাস’ পদ্ধতির মতো ঐতিহ্যবাহী কৃষিব্যবস্থায় ভুট্টা চাষিরা বিশালদেহী কয়েকটি দলবদ্ধ বোলতা, পিঁপড়া এবং কেন্নোর মতো উপকারী পোকাদের কাজের স্বীকৃতি দিতে পেরেছে সেখানে প্রায়শই তাদের ফসলের  ‘অভিভাবক’ বা ‘দেবদূত অভিভাবক’ হিসেবে দেখা যায়। তাদের মধ্যে অনেকই তৃণভোজীদের এমন কি অর্থনৈকিভাবে সীমাবদ্ধ কীট হিসেবে গণ্য করেন না এবং এর ফলে তারা সক্রিয়ভাবেই কীটনাশক ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকেন।

পর্যবেক্ষণভিত্তিক জ্ঞান কৃষকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উসকে দিতে পারে। প্রমাণস্বরূপ, হনডুরাসের কৃষি-শ্রমিকেরা পিঁপড়াদের আকৃষ্ট করতে চিনির সিরা ছিটায় এবং এর মাধ্যমে জৈবিক দমন করে। দক্ষিণে, ভলিবিয়ার আলটিপ্লানোতে ক্ষুদ্র কুইনোয়া চাষিরা অধীর আগ্রহের সাথে বর্ণনা করেন, কীভাবে গর্তে বাস করা নানা প্রজাতির বেলাতা [Sphecidae] শুঁয়োপোকা শিকার করে এবং [দেশীয়] ফুলগাছ থেকে মধু আহরণ করে ক্ষেতে নিজেদের সংখ্যা বজায়ে রাখে, যেমন আনন্দদায়ক এই ভিডিওতে দেখা যায়- The wasp that protects our crops’        

এগ্রোইকোলজিকাল ভারসাম্য ধরে রাখতে ক্ষুদ্র খামারিদের এ-ধরনের প্রথম পর্যবেক্ষণই একমাত্র চাবিকাঠি নয়, একইসাথে তাদের প্রচলিত এক-ফসলি চাষাবাদের পুনরায় নকশা তৈরি করা এবং প্রতিকারের জন্য উপযুক্ত নির্দেশনা প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে বড়ো পরিসরে এক-ফসলি কুইনোয়া চাষের বেলায় প্লেগের প্রাদুর্ভাবের কারেণে মড়ক লেগে ফসল কমে যায়। এ-ধরনের খামারে দেশীয় জীবন্ত গাছের বেড়া স্থাপন করার ফলে সেইসব গাছের ফুল থেকে প্রচুর পরিমাণে মধু সরবরাহ করে বোলতারা সামগ্রিক ইকোসিস্টেমের স্থিতিস্থাপকতা পুনরুদ্ধার করতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত ইকোলজিকাল নিবিড়তায় অপরিসীম অবদান রাখে। কৃষকেরা কেমন করে এমন ধরনরে জীবন্ত বেড়ার ব্যবস্থাপনা করে থাকেন তা এখানে দেখুন - ‘Living windbreaks to protect the soil’.  

  

বৈশ্বিক প্রাসঙ্গিকতায় উদ্ভাবন

বেশিরভাগ কৃষক অক্লান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন, সম্পদ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো, ফসল তোলা এবং উপার্জন বাড়নোর জন্য তারা নানাদিক থেকে ক্রমাগত চেষ্টা করে চলেছেন। যখন তারা প্রয়োজনীয় (ইকোলজিকাল) অন্তর্দিষ্টি মেলে নিরিক্ষণ করেন তখন ফসলের কীটপতঙ্গ দমনের একটি উদ্ভাবনী সমাধান বের করতে পারেনÑ এমনকি যখন এই হুমকি হঠাৎ করেই এসে পড়ে। হনডুরাসের চাষিদের চিনির সিরা ছিটানো বা ভলিবিয়ায় কুইনোয়া ক্ষেতে জীবন্ত গাছের বেড়া বনানো এমন উদ্ভাবনীগুলোর সীমাবদ্ধতা হলো এগুলো ফসলের ধরন এবং কৃষিজলবায়ুর ধরন অনুযায়ী সবক্ষেত্রে কাজে লাগে না। তবে বিশ্বজুড়ে এর মূল নীতিগুলো অভিন্ন।        

যখন কেচো বা ফল আর্মিওয়ার্ম মারাত্মক আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে তখন কেনিয়ার কয়েকজন কৃষক পিঁপড়া অথবা রোভ গুবরেপোকা যে কেচো নিয়ন্ত্রণ করে তা কেবল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণই করেন না বরং তাদের

দ্রুত খাবার দিয়ে (বিকল্প, শিকারি নয়) আকৃষ্ট করেন। (এখানে দেখুন : Killing fall armyworms naturally)

আক্রমণাত্মক ফলের মাছি মোকাবিলায় ঘর্মাক্ত ঘানার আমচাষিরা খুব তাড়াতাড়ি তাঁতি পিঁপড়ার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন, যা এই আকর্ষণীয় ভিডিওতে দেখা যায় : ‘Weaver ants against fruit flies’.   ভিয়েতনাম, মায়ানমার এবং চিনের আমচাষিরা হাজার বছর ধরে এই পিঁপড়াগুলোর যতœ করছেনÑ স্থানীয় কৃষকেরা তাদের মুরগির নাড়িভুড়ি খেতে দেন, ছিটানো কীটনাশক থেকে রক্ষা করেন এবং তাদের চারণক্ষেত্র বাড়নোর জন্য বাঁশ দিয়ে সেতু নির্মাণ করে দেন।  

কয়েকজন কৃষকের এরকম কিছু উদ্ভাবনী দক্ষিণ-দক্ষিণ স্থানান্তরের ফলে ফসল, দেশ ও মহাদেশের সীমানা অতিক্রম করে ইকোলজিকাল জ্ঞান এবং অগ্রসর জৈবিক দমন প্রক্রিয়ায় একটি অভ‚তপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এটি প্রকৃতপক্ষে Access Agriculture video platform-এ কল্পনা করা যায়।

জীববৈচিত্র্য ও মানব-স্বাস্থ্য, কৃষকদের জন্য একটি সত্যিকারের জয়

আমি পুরনো পালঙ্কে বসে দাদির কোমল ও মিষ্টি স্বাদের গুজবেরিফলগুলোর কথা স্মরণ করছি। এখন ৩০-৪০ বছর পরে, আমি বুঝতে পেরেছি যে, কীটপতঙ্গ দমনে উপকারী পোকামাকড়গুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ। দাদি যদি কেবল জানতেন যে, এই ক্ষুদ্র গুবরেপোকা এবং রোভ গুবরেপোকাগুলো কী ছিল তাহলে তাঁর বাগানটি প্রকৃত অর্থেই উদ্ভিদ এবং প্রাণীদের সত্যিকারের আশ্রয়স্থল হতে পারত এবং অরগানোফসফেট ছিটানোর দরুন তাঁর গুজবেরিফলগুলোও দূষিত হতো না। 

দ্রষ্টব্য: জাতিসংঘ ২০২০ কে উদ্ভিদ স্বাস্থ্যের আন্তর্জাতিক বছর (আইওয়াইপিএইচ) হিসাবে ঘোষণা করেছে। এর উদ্দেশ্যগুলির মধ্যে একটি হ'ল ইকোলোজি পদ্ধতিকে জোরাল করা, যা কীটনাশকের ব্যবহারকে হ্রাস করার সাথে সাথে স্বাস্থ্যকর ফসল ফলনের জন্য বিভিন্ন পরিচালনা কৌশল এবং অনুশীলন সম্পর্কে অবগতি করে। পোকামাকড় মাড়ার বিষাক্ত উপাদান পরিহার করলে এটি শুধুমাত্র যে পরিবেশ রক্ষা করে তা নয়, এছাড়াও পরাগায়ন কীট, প্রাকৃতিক কীট শত্রু, উপকারী জীব এবং উদ্ভিদ নির্ভরশীল মানুষ ও প্রাণীকেও রক্ষা করে।

আরও পড়তে পারেন

Wyckhuys, K.A.G., Heong, K.L., Sanchez-Bayo, F., Bianchi, F.J.J.A., Lundgren, J.G. and Bentley, J.W. (2019) Ecological illiteracy can deepen farmers’ pesticide dependency. Environmental Research Letters 14(9), 093004. https://iopscience.iop.org/article/10.1088/1748-9326/ab34c9/meta 

Wyckhuys, K.A.G., Aebi, A., Bijleveld van Lexmond, M.F.I.J., Bojaca, C.R., Bonmatin, J.M., Furlan, L., Guerrero, J.A., Mai, T.V., Pham, H.V., Sanchez-Bayo, F. and Ikenaka, Y. (2020)  Resolving the twin human and environmental health hazards of a plant-based diet. Environment International 144:106081. https://doi.org/10.1016/j.envint.2020.106081

Wyckhuys, K.A.G., Sasiprapa, W., Taekul, C. and Kon, T. (2020) Unsung heroes: fixing multifaceted sustainability challenges through insect biological control. Current Opinion in Insect Science 40:77–84. https://doi.org/10.1016/j.cois.2020.05.012

Wyckhuys, K.A.G. and Zhou, W. (2020, September 1) Greener Revolution. https://natureecoevocommunity.nature.com/posts/invertebrate-catalysts-of-a-greener-revolution


ক্যাটাগরিসমূহ